ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ??
গত কয়েকদিন ধরেই ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে টানটান উত্তেজনা চলছে তাতে মনে হচ্ছে এই বুঝি যুদ্ধ বেঁধে গেল,কিন্তু আসলে কি ব্যাপারটা এতই সহজ।আসুন একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক।
ইতিহাস বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা বহু ছোট বড় যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে ছিল।নিজ স্বার্থ বা ক্ষমতা জাহির যে কারণেই তা হোক।কিন্তু পরিস্থিতির মার প্যাচে ব্যাপারটা এখন অন্য।আমেরিকা নিশ্চয়ই ১৯৫৩ কিংবা ১৯৭৯ সালের ইরানের সাথে আজকের ইরানের তুলনা করার মতো শিশুসুলভ ভুল করবে না।ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটি অনেক ক্ষেত্রেই স্ব-নির্ভরতা অর্জন করেছে।তাই আমেরিকা বেকার যুদ্ধের ডাক দিবে না।এম্নিতেই উত্তর কোরিয়া,তুরস্কের মতো মাঝারি হুমকির মুখে তারা।সুতরাং,সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তার ফায়দা যে এই দেশগুলো নিবেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।তাছাড়া আমেরিকা উত্তর মেরুতে থাকলে রাশিয়া যে বরাবরের মতো এবারও দক্ষিণ মেরুতে থাকবে তা বুঝেই বলা যায়।তার উপর আবার চীনের উত্থান ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। সব মিলিয়ে অনেকটাই চাপে আছে।চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আমেরিকার জন্য সবসময়ের সবচেয়ে বড় হুমকি।ইরানের ওপর আমেরিকার দীর্ঘ সময়ের নিষেধাজ্ঞার পরে ও আজ ইরান এতদূর এগিয়ে গেছে।নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্র তৈরিতে এখন সক্ষম তারা।আর তাদের বিমান বাহিনী বিশ্বের সেরা বিমান বাহিনী গুলোর একটি।সুতরাং,আমেরিকা কথা বলে বলে অন্তত সংঘাতে জড়াতে চাইবে না।বরং কিভাবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে রুখা যায় সম্ভবত সেই পথেই হাটবে। মমধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধাঁ ইরান।আর ইরানকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একক মোড়ল হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ করবে এটা অন্তত চীন-রাশিয়া মেনে নেবে না।কারণ এতে তাদের স্বার্থে চরম আঘাত আসবে। আর তা তারা কখনোই মেনে নেবে না।সুতরাং ইরান আমেরিকা সংঘাত শুরু হলে এই দুই পরাশক্তি যে বসে থাকবে না তা আর নিশ্চয়ই বলতে হবে না।সুতরাং, যুদ্ধ আপাতত নয়,আর একান্ত সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি যে খারাপ হবে তা দুই দেশই জানে।এএফপির প্রকাশিত খবরে বলা হয় ইরানের হামলার ভয়েই জার্মানি ও নেদারল্যান্ড ইরাকে মোতায়েন করা তাদের সেনাদের সরিয়ে নিয়েছে।এটা যে সত্যি তার প্রমাণ মিলে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিবৃতিতে।এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও ইরাক থেকে তাদের বেসামরিক লোকদের দেশের ফেরার আহবান জানিয়েছে। কারণ পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় তা বলা মুশকিল। অনেকে মনে করছেন লোকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য এই যে আমেরিকা ইরানে সামরিক অভিযান চালাবে।ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান সিনেটরা।ইউরোপও সম্ভবত ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে সমর্থন করছে না। যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে বলছে।এতে যে তাদেরই ক্ষতি বেশি হবে তা বলাই যায়।কারণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করা বাকি ৫ টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই একঘুয়েমিতাকে যে মেনে নেবে না তা স্পষ্ট।রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য আমেরিকাকেই দায়ী করছেন।এছাড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোপনে ইরান সফর করেছেন।কাতার সংকটের সময় ইরান খাদ্যশস্য পাঠিয়ে কাতারকে অনেক সাহায্য করেছে।কাতারে অর্থের অভাব নেই।ইরান যে এই সুবিধা নিবেই তা শতবেগ নিশ্চিত। আর কাতারও বিপদের সময় ইরানকে ছেড়ে বর্তমান প্রধান শত্রু সৌদির সাথে তাল মেলাবে না তা চোখ বুঝে বলা যায়।ইরান ছোট ছোট বুটে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে সাগর সীমানায় রওনা হচ্ছে।আবার যুক্তরাষ্ট্র ও যুদ্ধবিমানসহ রণতরী উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করেছে।এতে অনেক বিশেষজ্ঞ একে যুদ্ধের পূর্বাভাস বললে ও আসলে দুই দেশই নিজেদের প্রাথমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই কাজটি করেছে।সুতারাং, এটা নিয়ে যুদ্ধের পূর্বাভাস দেওয়া হবে বোকামি।তাছাড়া স্বয়ং আমেরকানরাই এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে। ট্রাম্পও সম্ভবত চান না অন্তত এই মূহুর্তে কোন সংঘাত।আর ইরানও যথেষ্ট বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে নিজেদের সংঘত রেখেছে। সুতরাং,আপাত দৃষ্টিতে উত্তেজনা থাকলেও পুরো আলোচনা থেকে বলা যায় না যে যুদ্ধ একেবারেই আসন্ন,তবে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারেনা।
